Saturday, February 17, 2007

"বাবা, আপনাকে খুব ভালোবাসি"

এ যে রক্তের সাথে রক্তের টান- স্বার্থের অনেক ঊর্ধ্বে...
"বাবা, আপনাকে খুব ভালোবাসি।" কথাটা আজ পর্যন্ত বলতে পারিনি। ছোট বেলায় বলেছিলাম কিনা মনে নেই। কিন্তু বুঝে উঠা শিখার পর বলেছি কিনা মনে পড়ে না। অথচ বাবা কতোই না আপন।
মা-কে তুমি বললেও বাবাকে সবসময় আপনি করেই বলে এসেছি। আজও বলি। দূরত্ব? তা মনে করি না। বাবার সাথে গান শুনতাম আগেও, এখনো শুনি। যার সাথে নিজের সবচেয়ে প্রিয় কাজটি শেয়ার করতে পারি, তার সাথে কীসের দূরত্ব! বাবার সাথে সম্পর্কটা ঠিক কেমন জানি, বুঝি না। পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট আমি। আমার প্রতি সবার ভালোবাসাটা একটু বেশীই। সবার চিন্তা আমাকে নিয়ে। স্নেহের জোয়ারে এখনো ভাসি যখনতখন।
সেদিন অবরোধ ছিলো। খুব জরুরী কাজে মতিঝিল যাওয়া খুব প্রয়োজন। আম্মাকে কোনোভাবে ম্যানেজ করলাম। আব্বা কিছুতেই রাজি হলেন না। তাঁর এক কথা- “টাকা-পয়সার ক্ষতি হলে হোক, যাওয়ার কথা মুখে এনো নাÓ।
আমার এক বন্ধুর কথা বলিঃ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময় সে কয়েকটা পরীক্ষা দিয়ে পলাতক হয়েছিলো (ভেবেছিলো ফেল করবে কিন্তু করেনি, এই না হইলো নটরডেমিয়ান!)। অনেকটা দেশভ্রমণের মতো। বেশ কিছুদিন পর সে বাসায় ফিরলো। তখন ওর বাবা ওকে ডেকে নিয়ে পাশে বসায়। তারপর ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না। বন্ধুটি ভাবতো, বাবা একটা কাঠখোট্টা মানুষ। তার ভুল ভাঙলো। আসলে বাবারা হয়তো আবেগ তেমন করে প্রকাশ করেন না।
বাবা- যার জন্যে মাকে পেয়েছি, আমি আমি হয়েছি, কতো ভালো চারটি ভাই-বোন পেয়েছি, অসীম ভালোবাসায় এতোদূর এসেছি, তাকে সহস্র সালাম। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারি না "তোমাকে ভালোবাসি বাবা"।
জানাতে যতো যাই কথায় হারাই ততোই মানে, ভালোবাসি তোমায় তাই জানাই গানে...

"ছেলে আমার বড়ো হবে"
মাকে বলতো সে কথা,
"হবে মানুষের মতো মানুষ একলেখা ইতিহাসের পাতায়"
নিজ হাতে খেতে পারতাম নাবাবা বলতো,
"ও খোকা! যখন আমি থাকবো না, কী করবি রে বোকা! "
এ যে রক্তের সাথে রক্তের টান-
স্বার্থের অনেক ঊর্ধ্বে
হঠাৎ অজানা ঝড়ে তোমায় হারালাম
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো;
বাবা কতোদিন কতোদিন দেখিনা তোমায়
কেউ বলেনা তোমার মতো
"কোথায় খোকা! ওরে বুকে আয়।"
বাবা কতোরাত কতোরাত দেখিনা তোমায়
কেউ বলেনা "মানিক, কোথায় আমার! ওরে বুকে আয়।"
চশমাটা তেমনি আছে,আছে লাঠি ও পাঞ্জাবী তোমার,
ইজি চেয়ারটাও আছে নেই সেখানে
অলস দেহ শুধু তোমার;
আযানের ধ্বনি আজ শুনি,
ভাঙাবে না ভোরে ঘুম জানি,
শুধু শুনি না তোমার সেই দ্বরাজ কন্ঠে পড়া
পবিত্র কুরআনের বাণী।
বাবা কতোদিন কতোদিন দেখিনা তোমায়
কেউ বলেনা তোমার মতো
"কোথায় খোকা! ওরে বুকে আয়।"
বাবা কতোরাত কতোরাত দেখিনা তোমায়
কেউ বলেনা "মানিক, কোথায় আমার! ওরে বুকে আয়।"

২০০২ এর ডিসেম্বরে যখন মা-বাবা প্রবাসে গেলেন, ভেবেছিলাম কোন ব্যাপার না। আমি হলাম আবেগহীন মানুষ। কিছুই মনেটনে পড়বে না। কাউকেই না। কিন্তু মনে পড়ে। খুব পড়ে। কাছে পাওয়ার জন্য মনটা কেমন যেনো হয়ে যায়। যখন জেমসের এ গানখানা শুনি তখন হৃদয়ক্ষরণ কে আটকায়! কিছুদিন হলো মা-বাবা দেশে ফিরেছেন। ভাবি অবসর সময়ে কোথাও যাবো না। তাঁদের সাথেই থাকবো। কিন্তু পারি না। কেমন জানি হয়ে গেছি।! সেদিন শুনলাম পথিকের বাবা অসুস্থ; পরদিন শুনি তিনি মারা গেছেন। অজান্তেই চমকে উঠলাম- আমার বাবাও তো একদিন চলে যাবেন। প্রবাসে থাকলে তো অন্তত ফোনে কথা হয়, তখন তো আর কথাও হবে না। ভাবনাগুলোকে তাড়াতে পারি না। সত্যকে একদিন বরণ করে নিতেই হবে। জীবনের একটা সত্য, সেটা হলো মৃত্যু। সবাইকে বিদায় দিতে হবে, বাবা-মা-ভাই-বোন... ভাবি যদি কাউকেই বিদায় না দেয়া লাগতো। সবার আগে আমি চলে যেতাম, তাহলে বেশ হতো।...

Sunday, November 12, 2006

বন্ধুত্ব মানে

বন্ধুত্ব মানে-
মাটি আর আকাশে সুদূরপ্রান্তে সংঘবদ্ধ দাবি,

বন্ধুত্ব মানে-
সাগর-ঝর্ণা মাঝে মিলনের তলে বয়ে চলা কোন নদী।


বন্ধুত্ব এমন একটা শব্দ যার অর্থ আজও বুঝে উঠা হলো না। হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরি। কবিতা-গান। উক্তি। কথোপকথন। গল্প-উপন্যাস-নাটক-সিনেমা। আরো কতো কীসে চলে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা। মাঝে মাঝে আনন্দে লাফিয়ে ওঠি, এই তো বুঝেছি! পরক্ষণেই হোঁচট খাই। ‘নাহ্ ইহা যথার্থ নয়’ বলতে হয়। ধর্মগ্রন্থেও চোখ রাখি; এতো নিয়ম-কানুন! মন মানে না। ধরা-বাঁধা কোন নিয়মের গন্ডিতে বন্ধুত্বকে বেঁধে ফেলতে সে রাজি নয়। সে চায় সর্বদা সর্বস্তরে বন্ধুত্বের অবাধ বিচরণ। মুক্ত বিহঙ্গের মতো। ‘বীক্ষ্যমান’ বিশেষণে বিশেষণীয় হয় না বন্ধুত্ব।


বন্ধুত্বকে শুধু একটি কথায় বা শুধু একটি গানে কিংবা শুধু একটি কবিতায় সংজ্ঞায়িত করা যায়নি; এক কথোপকথনেই সীমাবদ্ধ করা যায়নি তার সীমানা। বন্ধুত্বের গভীরতা প্রকাশ সম্ভব হয়নি একটি মাত্র গল্পে অথবা উপন্যাসে। একখানা নাটক অথবা একখানা সিনেমা বানিয়েই বন্ধুত্বের মডেল বা আইকন স্থাপন করা যায় নি। বন্ধুত্ব নিয়ে লেখা হয়েছে কতো না কবিতা-গল্প-উপন্যাস! বন্ধু বন্ধুকে গেয়ে শুনিয়েছে কতো না গান! কতো না কথোপকথন! কথা চলছে অবিরাম বন্ধুকে নিয়ে। ছোট-বড়ো পর্দায় ভেসে উঠছে কতো না নাটক-সিনেমা! চলছে... চলবেই।


যাকে বন্ধু বলে পরিচয় দেই, কখনো কি ভেবে দেখেছি কেন তাকে বন্ধু বলছি।! না, ভাবি না। বন্ধুত্ব কোন সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা বিচার করে না। বয়সে বন্দি নয় বন্ধুত্ব। লিঙ্গান্তর নিয়ে বিভেদ নেই বন্ধুত্বে। শিক্ষা-অর্থবিত্ত-ধর্ম মানে না বন্ধুত্ব। কখনো কখনো রাস্তার একজন অশিক্ষিত টোকাই বন্ধু হয়ে যায়। বন্ধু শিক্ষিত হতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। কখনো কখনো একজন অসুন্দর মানুষ প্রাণের বন্ধু হয়ে যায়। বন্ধুত্বেই পবিত্র সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়। একজন চরম নাস্তিকও বন্ধু হয়। বন্ধুত্ব যে কখন কোথায় তার স্থান দখল করে তা কেউ বলতে পারেনি, পারবেও না।

জয়... বন্ধুত্বের জয়।।


বন্ধুত্বের অসংখ্য গানের সমারোহ হতে একটি গান, সবার জন্য-


বন্ধুত্ব মানে-
বয়সের সাথে বয়সের মিল নয়
বন্ধুত্ব মানে-
মনের সাথে মনের, গোপনে হয়ে যাওয়া পরিচয়।


বন্ধুত্ব মানে-
একাকীত্বের প্রতি অভিশাপ
বন্ধুত্ব মানে-
খুব প্রয়োজনে, খুঁজে পাওয়া ওই দুটি হাত।


বন্ধুত্ব মানে-
কবিতা কিংবা গানে
শব্দে-বর্ণে ছন্দের মতো নয়
বন্ধুত্ব মানে-
ছবির মতো করে
চোখে চোখ রেখে কথোপকথন নয়।


বন্ধুত্ব মানে-
মাটি আর আকাশে
সুদূরপ্রান্তে সংঘবদ্ধ দাবি
বন্ধুত্ব মানে-
সাগর-ঝর্ণা মাঝে
মিলনের তলে বয়ে চলা কোন নদী।


বন্ধু আমার, যেখানেই থেকে যাও
খুঁজে পেতে পারি হঠাৎ স্মরণে
বন্ধুত্বের ছলে, ছলে-বলে-কৌশলে
ধরা দিয়ো না মিছিমিছি ভালোবেসে;
বন্ধুত্ব মানে-
গোটা পৃথিবীটা তোমার
হতে পারে বন্ধুত্বের দাবিদার
বন্ধু আমার, বন্ধু তোমার,
বন্ধু তুমি হয়ে যেতে পারো সবার।


Friday, July 28, 2006

অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি

শুধু মৃত্যুর জন্য এই জন্ম,
শুধু মৃত্যুর জন্য কিছু খেলা,
শুধু মৃত্যুর জন্য একা হিম সন্ধেবেলা
ভুবন পেরিয়ে আসা।
শুধু মৃত্যুর জন্য অপলক মুখশ্রীর শান্তি একঝলক।
শুধু মৃত্যুর জন্য এত রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত।
শুধু মৃত্যুর জন্য, আরো বেঁচে থাকতে লোভ হয়-
মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা।

শুধু মৃত্যুর জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।।



[বাণী বসুর একুশে পা উপন্যাসে -শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম - দিয়ে শুরু একটা কবিতা পড়েছিলাম। তখনই ঐ কবিতার অনুকরণে আমি এই কয়েকলাইন লিখি। কিছু অংশ বাদও দিয়েছি। কবিতাটা ছিলো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। এই কবিতায় আমি কবিতাকে মৃত্য হিসেবেই পেয়েছি।]

Tuesday, April 4, 2006

সেই তুমি আজ

বহুদিন পর হলো দেখা
তোমার সাথে-
যাবার পথে।
এতোদিনে কেটে গেছে,
উড়ে উড়ে ভেসে গেছে
প্রায় তেরশ বছর।
তুমিও অনেকটা বুড়িয়ে গেছো।


ভাবিনি, তবুও আবার
পেলাম তোমার দেখা,
যে তুমি ছিলে আড়ালে- অদেখা।
কিন্তু এতটাই বুড়িয়ে গেলে এখন!


তোমাকেই দেখেছিলাম আমি
প্রথমবার চোখ মেলে
সেই তোমাকেই চেয়েছিলাম দেখতে
চোখ বোজার মুহূর্তে।


সেই তুমি আজ এতটা জীর্ণ!
তুমিও রেহাই পাওনি!


হে বিধাতা!
তুমি এতটাই নিষ্ঠুর কেন??


এপ্রিল ২০০৬

Wednesday, March 5, 2003

মৃত্যুর জন্যে

আজ তোমার জন্মদিন
এ দিনে তোমার আগমন
ভুলিনি
কেননা তুমি আমার বড়ই আপন।

কতজন জন্মায় প্রতিদিন
কতজন মারা যায়এ
ক একটা দিন মানেই তো জীবন-মৃত্যুর খেলা
তাহলে কি করে আমরা এমনই একটা দিনে জন্মোৎসবে মেতে উঠি ?
মেতে উঠি চরম আনন্দে!
ক্ষণিকের আনন্দে ভুলে যাই এক চরম সত্যকে
অবহেলা করি তাকে-
যে আমাকে গ্রাস করবে যে কোন ক্ষণে
হয়তো বা এখন
সে হলো মৃত্যু।
জন্মদিন তো আমার মৃত্যুদিনও হয়ে যেতে পারে,পারে না ?
তাহলে তোমরা কিভাবে জন্মদিনে আমাকে শুভেচ্ছা জানাবে ?
কেন আমি সেদিন মেতে উঠবো অহেতুক আনন্দ-উল্লাসে ?
কেন আমি সে সময়টা ব্যয় করিনা জীবন গড়তে ?
এবং মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হতে ?

তাই আমার জন্মদিনে আমি আনন্দ পাই না
পাই না কোন নতুনত্বের ছোঁয়া
পাই শুধুই মৃত্যুর গন্ধ
সে আসবে আমার একটি অসতর্ক মুহূর্তে।
সে কেন আমায় হঠাৎ আঘাত হানবে ?
আমি কি পারিনা সতর্ক থাকতে ?
আমি কেন তাকে বিজয়ী হতে দেব ?
বরঞ্চ তাকে সাদরে গ্রহণ করে আমি বিজয়ী হবো।
তাই উৎসবে মেতে না উঠে আমি প্রস্তুত থাকতে চাই
সে সময়ের জন্য যখনসে আসবে আমাকে হারাতে
কিন্তু
হারবো নাচিরতরে হারিয়ে গিয়েও আমি বিজয়ী হবো।

আমারও একদিন ঘটেছিল আগমন
আসবে আবার বিদায়ের ক্ষণ
হয়তো সবাই কাঁদবে তখন।

আজ তুমি করো এ পণ
“বিজয়ী হবো আজীবন”
কেননা তুমি আমার বড়ই আপন।

লড়াই কি শুধুই বেঁচে থাকার জন্য ?
তা কি হতে পারে না মৃত্যুর জন্যে ?

Friday, January 3, 2003

অদ্ভুত সকাল, মেনে নেয়া আমার বাস্তবতা

আজকের সকালটা ছিল অদ্ভুত
জেগে দেখি আমার উঠোনে সূর্যের সিঁদূরে জোনাক
সেই সাথে কুয়াশা ভেজা ঝিরঝির হাওয়া
রান্না ঘরে চায়ের কাপে টুং টাং শব্দ
তবু আমার মনে রাত্রির নিস্তব্ধতার নির্জনতা
কিন্তু সে নির্জনতা ভেঙ্গে দিল আমার প্রিয়ার হাত।

স্পর্শের নিবিড় আবেদন আমায় শিহরিত করে
অথচ দেহের কামনার কোন শিখা উঁকি দেয় না মনের গভীরে
নিস্তব্ধতা আমায় গ্রাস করে নির্জনভাবে
ভেসে যাওয়া মেঘের বিশালতা আমাকে ঝাঁপিয়ে দেয়
প্রিয়ার হাত ভুলে আমি উথাল-পাথাল কাব্যের সাম্রাজ্য খুঁজে ফিরি
নারী হলেও মনের গভীরে ওর অস্তিত্ব আমি খুঁজে পাইনি, তাই
সবকিছু ছেড়ে কবিতাকে নিয়ে উড়াল দেই
যেখানে আনকোড়া সব শব্দ, শব্দের গন্ধ আর
পিছুটানহীন জীবনের এক অনাবিল আনন্দ
সেখানে আমি পৌঁছে যাই হিমালয়ের বরফ ছেড়া চূঁড়ায়।

শুভ্র এ সকাল, কুয়াশার ঘোলাটে পর্দায় সূর্যের আদুরে বর্ণীল লুকোচুরি
যেমন লুকোচুরি চলছে আমার মনের অন্তরালে
তথাপি বাস্তবতা আমায় টেনে নামায় আমার কষ্টের কাছে
ভাবুক আমি আবার প্রিয়ার আলিঙ্গনে ডুবে যাই গত জন্মের মত
আমি মেনে নিই আমার বাস্তবতা - আমি মানুষ।।